আজ- বুধবার, ২৩শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ছাত্রলীগ নেতার রেস্তোরাঁয় ‘ রাবি ভিসির বিদায়ি নিয়োগের’ ছক


।। ডেস্ক রিপোর্ট।।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বিদায়ি উপাচার্যের ‘বিদায়ি গণনিয়োগ’ নিয়ে একের পর এক তথ্য সামনে আসছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিভাবে নিয়োগ দেওয়া হবে, কতজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে, কারা নিয়োগ পাবে—সেসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে ৪ মে রাতে গোপন বৈঠকে বসেন উপাচার্য। আর বৈঠকটি হয় রাবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন মুনের রেস্তোরাঁয়। বৈঠকের সমন্বয়ক ছিলেন মুন নিজেই।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গত বুধবার শিক্ষকসহ বিভিন্ন পদে ১৪১ জনকে অ্যাডহকে নিয়োগ দিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়েন বিদায়ি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুস সোবহান। এরপর এই নিয়োগ নিয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষও হয়। বেরিয়ে আসতে থাকে উপাচার্যের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য। তবে এসব অনিয়মে শুধু উপাচার্য নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও উপাচার্যের অনেক আত্মীয়-স্বজনও জড়িত। উঠে এসেছে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের নামও।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়োগের আগে উপাচার্য তাঁর জামাতা ও আইবিএর শিক্ষক এ টি এম সাহেদ পারভেজ, ভাগ্নে ও উপরেজিস্ট্রার সাখাওয়াত হোসেন টুটুল, রাবি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন মুনসহ আরো কয়েকজনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন কাজলা এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় গোপন বৈঠক করেন। সেখানে কিভাবে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা করেন উপাচার্য। সেখানে সদ্যোনিয়োগ পাওয়া ছাত্র উপদেষ্টা তারেক নূর ও কয়েকজন ছাত্রনেতাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে চাকরিপ্রার্থী ছাত্রলীগ নেতারা মুন ও তারেক নূরের ওপর চড়াও হয়েছিলেন। শেষে এই সিদ্ধান্ত হয় যে পরের দিন (৫ মে) ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের চাকরির বিষয়টি চূড়ান্ত করে ৬ মে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করবেন উপাচার্য, যদিও নিয়োগ পাওয়া ১৪১ জনের মধ্যে ছাত্রলীগের রয়েছেন ২৫ থেকে ৩০ জন।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, রাবি ছাত্রলীগের সাবেক অন্তত অর্ধশত নেতা তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পেতে ড. সোবহানের কাছে ঘুরছিলেন প্রায় এক বছর ধরে। তাঁর আত্মীয়-স্বজন এবং রাবি ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সারির কয়েক নেতাও তাঁদের পরিচিতজনদের কাছ থেকে চাকরি বাবদ টাকা তুলতে থাকেন। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বরে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব ধরনের নিয়োগে স্থগিতাদেশ দিলে বিপাকে পড়েন উপাচার্য। তিনি জানান, স্থগিতাদেশ লঙ্ঘন করে তিনি নিয়োগ দেবেন না।

ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা কালের কণ্ঠকে জানান, তাঁরা যখন জানতে পারেন যে উপাচার্য নিয়োগ দেবেন না, তখন ৪ মে রাতে তাঁরা উপাচার্যের ভাগ্নে ও উপরেজিস্ট্রার সাখাওয়াত হোসেন টুটুলের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে ঘিরে ধরেন। তাঁরা বলেন, হয় চাকরি দিতে হবে, নয়তো টাকা ফেরত দিতে হবে। এতে বাধ্য হয়ে টুটুল উপাচার্যকে নিয়োগের জন্য চাপ দিতে থাকেন। অন্যদিকে জামাতা এ টি এম সাহেদ পারভেজও তাঁর পছন্দের লোকদের চাকরি দিতে উপাচার্যকে চাপ দেন। এমনকি সাহেদ পারভেজ তাঁর মাকে দিয়েও ড. সোবহানকে ফোন করান। অন্যদিকে রাবি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন মুনও তাঁর কাছের লোকদের চাকরি দিতে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। চারদিক থেকে এসব চাপ সামাল দিতেই মুনের রেস্তোরাঁয় গোপন বৈঠক আয়োজন করা হয়।

নিয়োগপ্রক্রিয়ায় উপাচার্যকে যাঁরা সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের মধ্যে সহকারী রেজিস্ট্রার মামুন-উর-রশিদ, সদ্যোনিয়োগ পাওয়া ছাত্র উপদেষ্টা তারেক নূর ও মাদার বখস হলের প্রাধ্যক্ষ শামীম হোসেনের নামও রয়েছে।

যোগদানে স্থগিতাদেশ

নিয়োগ পাওয়া ১৪১ জনের যোগদান স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুস সালাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গত বুধবার (৫ মে) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডহকে যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবৈধ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। এই কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনোরূপ সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগপত্রের যোগদান এবং তত্সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম স্থগিত করার জন্য অনুরোধ করা হলো।’

তদন্ত কমিটির সদস্যরা ক্যাম্পাসে

নিয়োগে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে ক্যাম্পাসে গেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। গতকাল সকাল পৌনে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন কমিটির সদস্যরা। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে আছেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর। কমিটির সদস্যরা গতকাল ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাৎ করেছেন ড. আব্দুস সোবহানের সঙ্গে। তদন্তদলের সঙ্গে বৈঠকের পর আব্দুস সোবহান সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিয়োগে মানবিক দিকটি বিবেচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশে উপাচার্যকে একটা ক্ষমতা দেওয়া আছে। সেই আইনের বলে আমি নিয়োগটা দিয়েছি।’

ডেইলি/ এস

সূত্র: কালের কন্ঠ


এই রকম আরও খবর

সর্বশেষ খবর

বিশেষ খবর