আজ- বুধবার, ২৩শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

জবানবন্দির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিরাপত্তা চেয়ে মুসার স্ত্রীর জিডি


।। ডেস্ক রিপোর্ট।।

চট্টগ্রামে চাঞ্চল্যকর মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলায় আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করেছেন মুসার স্ত্রী পান্না আক্তার।

মঙ্গলবার (১ জুন) দুপুর সাড়ে ১২টায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানায় জিডি করেন তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুব মিল্কি।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ঘটনার পর তাকে ফোনে হুমকি দেয়া হয়। গতকাল (সোমবার) তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন। তাই নিজের ক্ষতি হতে পারে ভেবে তিনি জিডি করেছেন।

জিডির বিষয়ে পান্না আক্তার বলেন, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার জন্য থানায় জিডি করেছি। মিতু হত্যা মামলায় আদালতে জবানবন্দি দেয়ার পর থেকে নিজের মধ্যে ভয় কাজ করছে। যদিও তাকে কেউ হুমকি দেয়নি বলে জানিয়েছেন।

কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মধ্যম ঘাগড়া গ্রামের শাহ আলমের ছেলে। তিনি নগরীর বাকলিয়া থানার কালামিয়া বাজার এলাকায় স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকতেন।

এর আগে সোমবার (৩১ মে) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হোসাইন মোহাম্মদ রেজার আদালতে মিতু হত্যা মামলায় সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন পান্না আক্তার। সেখানে বাবুল আক্তারের সঙ্গে মুছার ঘনিষ্ঠতা ও মিতু হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড যে বাবুল আক্তারই, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

বাবুল আক্তারের গ্রেপ্তারের পর থেকে তাকে জড়িয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিতে থাকেন মুসার স্ত্রী পান্না আক্তার। তিনি অভিযোগ করে বলেছিলেন, ঘটনার পর ১৬ দিন পর্যন্ত পরিবারের সাথে ছিলেন মুসা। তখন বাবুল আক্তার কয়েকটি ল্যান্ডফোন নম্বর থেকে মুসার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। এ সময় মুসাকে সাবধানে চলাফেরা করার পরামর্শও দেন বাবুল। ধীরে ধীরে সব সামলে নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয় তাকে।

পান্নার দাবি, দুই ভাইকে আটকের পর খুবই ভেঙে পড়ে মুসা। এ সময় মুসা সব ঘটনা ফাস করে দেয়ার হুমকিও দেয় বাবুলকে। এক পর্যায়ে স্ত্রীর কাছে স্বীকার করে খুনের সাথে জড়িত থাকার কথাও।

কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা বাবুলের স্ত্রী মিতুকে কিলিং মিশনের নেতৃত্বদাতা হিসেবে অভিযুক্ত। হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজে একজনকে দেখা গিয়েছিল, পুলিশ তদন্ত করে যাকে মুসা হিসেবে শনাক্ত করেছিল।

এছাড়া তদন্তে বেরিয়ে এসেছিল, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা ইউনিটে কর্মরত থাকার সময় ওই মুসা তার সোর্স ছিলেন। কিন্তু সেসময় ঢাকায় গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি মুসাকে চেনেন না বলে জানিয়েছিলেন।

কেনো বাবুল আক্তার খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মুছাকে না চেনার ভান ধরছেন- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গত ৪ মাস ধরে পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম জেলা ও মেট্রো ছাড়াও এই মামলার তদন্তে একযোগে কাজ করে ঢাকার চারটি, গোপালগঞ্জ ও খুলনার দুটি ইউনিট। তারা একইসঙ্গে বাবুল আক্তার, ব্যবসায়ীক পার্টনার সাইফুল ও মুসার আত্মীয় গাজী আল মামুনকে নজরদারির আওতায় আনে। এরপর গত ১২ মে পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে মুছাকে চেনার বিষয়টি স্বীকার করেন বাবুল আক্তার। পরে ৫ দিনের রিমান্ডে বাবুল আক্তারই যে খুনের পরিকল্পনাকারী এবং মুছা তার নেতৃত্বদাতা তা পিবিআইয়ের কাছে স্বীকার করেন বাবুল।

কিন্তু গত ১৭ মে মিতু হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে জবানবন্দি দেয়ার জন্য হাজির করা হয়। বিচারক নিয়ম অনুযায়ী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ার জন্য তাকে তিন ঘণ্টা সময় দেন। জবানবন্দি দিতে রাজি হলে বাবুলকে বিচারকের চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম সারোয়ার জাহানের খাসকামরায় নেয়া হয়। কিন্তু পরে জবানবন্দি দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এছাড়া গত ২৯ মে বেলা সাড়ে ১০টার দিকে কারাবন্দি সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফেনী কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, কারাগারে বসে একই মামলায় কারাবন্দি অন্য আসামিদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিলেন বাবুল আক্তার। তার সম্পৃক্ততা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে মুখ না খুলতে বিভিন্ন মাধ্যমে আসামিদের চাপ দিচ্ছিলেন তিনি।

এই মামলায় গত ২০ মে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার জাহানের আদালত কারাবন্দি শাহজাহান মিয়াকে (২৮) গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। তিনি মামলার ৮ নম্বর আসামি। এর আগে একই ঘটনায় বাবুল আক্তার বাদী হয়ে দায়ের হওয়া প্রথম মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন শাহজাহান।

এ নিয়ে মিতু হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া নতুন মামলায় বাবুল আক্তারসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো। পাঁচজনই নতুন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।

তথ্যমতে, ওয়াসিম ও আনোয়ার প্রায় ৫ বছর ধরে কারাগারে আছেন। পাশাপাশি আরও দুই আসামি সাইফুল ইসলাম সিকদার এবং শাহজাহান মিয়া আছে চট্টগ্রাম কারাগারে। মিতু হত্যার পর ২০১৬ সালের ২৬ জুন আনোয়ার ও ওয়াসিমকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। আর সাইফুল ইসলাম সিকদার মামলার ২ নম্বর আসামি লাপাত্তা থাকা মুসার আপন ভাই। মিতুর পিতা হত্যা মামলা দায়ের করলে রাঙ্গুনিয়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব।

অপর আসামি শাহজাহান মিয়াও আগে থেকেই কারাগারে ছিলেন। ২০ মে মহানগর হাকিম সারোয়ার জাহানের আদালত শাহজাহান মিয়াকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। এর আগে ওয়াসিম ও আনোয়ারকে পিবিআইয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন।

এই মামলায় কামরুল ইসলাম শিকদার প্রকাশ মুসা শুরু থেকেই রয়েছে আড়ালে। আরেক আসামি খায়রুল ইসলাম কালুরও কোনো খোঁজ পায়নি পুলিশ কিংবা পিবিআই।

মুসার পরিবারের দাবি, ২০১৬ সালে মিতু হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পর পুলিশ মুসাকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু পুলিশ তা অস্বীকার করছে শুরু থেকে। কারাগারে থাকা ওয়াসিম আর আনোয়ারের আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছিল মুসার নির্দেশেই তারা হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

এদিকে মিতু হত্যাকাণ্ডের ২৩ দিনের মাথায় মনির নামে এক সহযোগীসহ এহতেশামুল হক ভোলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেসময় পুলিশ জানিয়েছিল, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র সরবরাহ করেছিল ভোলা। ভোলার বিরুদ্ধে মিতু হত্যা ছাড়াও ডবলমুরিংয়ে ট্রাকচালক হত্যা, পাঁচলাইশে নার্সিং কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অঞ্জলী রাণী দেবী হত্যাসহ দুই ডজনের কাছাকাছি মামলা রয়েছে। সব মামলায় জামিন নিয়ে করোনার মধ্যে কারাগার থেকে বের হয় ভোলা। এরপর থেকে ভোলাও উধাও।

সব মিলিয়ে মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মোশারফ হোসেনের দায়ের করা মামলার ৮ আসামির মধ্যে দুইজন শুরু থেকেই লাপাত্তা। জামিনে গিয়ে উধাও একজন। অপর চার আসামি আছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশ থানার ওআর নিজাম রোডে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে বাসার অদূরে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয় মাহমুদা খানম মিতুকে। স্ত্রীকে খুনের ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরের তৎকালীন এসপি বাবুল আক্তার বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। জিজ্ঞাসাবাদসহ নানা নাটকীয়তার পর ওই বছরের আগস্টে বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। এরপর মামলার তদন্তে গতি আসে। ১৫ মাস পর গত ১১ মে বাদী বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে নেয় পিবিআই। তবে এর আগেই ঘটনার সঙ্গে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। পরদিন আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় বাবুল আক্তারের মামলার।

এরপর মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন নগরীর পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে নতুনভাবে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় আরও ৭ জন আসামি আছেন। এরা হলেন- মো. কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুসা (৪০), এহতেশামুল হক ওরফে হানিফুল হক ওরফে ভোলাইয়া (৪১), মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম (২৭), মো. আনোয়ার হোসেন (২৮), মো. খায়রুল ইসলম ওরফে কালু (২৮), সাইদুল ইসলাম সিকদার (৪৫) ও শাহজাহান মিয়া (২৮)। এই মামলাও তদন্ত করছে পিবিআই।

মোশাররফ হোসেনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১২ মে বাবুল আক্তারকে আদালতে হাজির করে পিবিআই। আদালত তার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বাবুল আক্তারকে পিবিআই হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ডেইলি/ এস


এই রকম আরও খবর

সর্বশেষ খবর

বিশেষ খবর