আজ- বুধবার, ১২ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পুকুরে বিলীন বিল ও ফসলি জমি

  • 32
    Shares

।। আনোয়ার আলী হিমু ।।

রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষক মোতাহার হোসেনের ফসলি জমিগুলো কয়েক বছর ধরেই জলাবদ্ধ থাকে। পানিতে গ্রাম ডুবে যায়, এমনকি তার ঘরের মধ্যেও পানি ঢোকে। ফলে, ধান আবাদ করতে পারেন না তিনি।

মোতাহার হোসেনের বর্ণনা করা এই চিত্র জলবায়ু পরিবর্তন বা মৌসুমি বন্যার কোনো প্রভাব নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রাজশাহী বিভাগের নিচু ফসলি জমি নির্বিচারে মাছ চাষের জন্য পুকুরে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষার পানি জমা হয় যে বিস্তীর্ণ বিলগুলোতে, সেগুলোর বুক চিরে খনন হচ্ছে পুকুর।

এই পুকুরগুলোর উঁচু পাড় বর্ষার পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে বর্ষাকাল তো বটেই, অনেক সময় শুষ্ক মৌসুমেও পুকুরগুলোর আশেপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

জলাবদ্ধতায় তিন ফসলি জমি অনাবাদী পড়ে থাকে এবং ধান আবাদ বিলম্বিত হয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

 আলাপকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক এবিএম মহসিন বলেন, ‘কোন এলাকায় কতগুলো পুকুরের প্রয়োজন আছে এবং পরিবেশের ওপর সেগুলোর কী প্রভাব পড়তে পারে, সেসব বিবেচনা না করেই যথেচ্ছভাবে পুকুর খনন করা হচ্ছে। এসব অপরিকল্পিত পুকুর কৃষকদের জীবন ও জীবিকা হুমকিতে ফেলছে।’

কৃষক মোতাহার বলেন, ‘এই পুকুরগুলো আমাদের দরকার নেই। এগুলোই আমাদের ধ্বংসের গোঁড়া।’

তিনি জানান, জলাবদ্ধতায় ধান চাষ করতে না পেরে কৃষক চাল ও গবাদি পশুর জন্য খড় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফসলের জমি না থাকায় তারা কাজও হারাচ্ছেন।

কৃষক ও উন্নয়ন কর্মীরা বলেছেন, এই অঞ্চলে পুকুর খননের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন রাজনীতিবিদ ও ধনী প্রভাবশালীরা। তাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট আইন না থাকার অজুহাতে অন্ধ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকে স্থানীয় প্রশাসন।

রাজশাহী-৩ আসনের (পবা-মোহনপুর) সংসদ সদস্য মো. আয়েন উদ্দিন স্বীকার করেন যে তিনি তার এলাকায় গত পাঁচ বছর ধরে ১৫০ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে অন্তত তিনটি পুকুর পরিচালনা করছেন।

পাঁচ বছর আগে পবা উপজেলার পারিলা এলাকা পরিদর্শনকালে, এই প্রতিবেদক সর্বপ্রথম পুকুর খননের কর্মযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেন। তখন গ্রামবাসীরা বলেছিলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ফসলি জমি ইজারা নিয়ে পুকুরগুলো খনন করাচ্ছেন।

গত ফেব্রুয়ারিতে সংসদ সদস্য মো. আয়েন উদ্দিন দাবি করেন, তার ইজারা নেওয়া জমিগুলো এক ফসলি ছিল এবং তার পুকুরগুলো কারো ক্ষতিসাধন করছে না।

তবে, নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে একাধিক স্থানীয় কৃষক ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, যে পুকুরগুলোর কারণে প্রতি বছর তাদের ফসলের জমিতে এবং বাড়ির আশেপাশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় তার মধ্যে এই সংসদ সদস্যের পুকুরগুলোও আছে।

সিরাজগঞ্জের চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব এসএম মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা স্থানীয় প্রশাসন এবং পুকুরের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি সমঝোতার কথা শুনে থাকি।’

তিনি যোগ করেন, ক্ষতিগ্রস্ত হলে গ্রামবাসীরা রাস্তায় নামেন, বিক্ষোভ করেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা আসেন, অল্প সময়ের জন্য পুকুর খনন থামে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, প্রভাবশালীরা পুকুর খনন করেন এবং স্থানীয় প্রশাসন নীরব থাকে।

‘পুকুরে পুকুরে চলনবিল ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে এবং হচ্ছে। বিল বলে কিছু আর থাকছে না,’ যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, চলনবিল এখন অন্তত ১০০টি বিলে বিভক্ত। এসব বিলের তিন ফসলি জমির অধিকাংশই জলাবদ্ধতার কারণে এক ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে।

ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. মো হুমায়ুন কবির বলেন, ‘পুকুর খনন বন্ধ করতে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন বা নীতিমালা নেই।’

বিভাগীয় প্রশাসনের শীর্ষ এই কর্মকর্তা অবশ্য একমত প্রকাশ করেছেন যে, অন্য কারো জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং বিলের বা যে কোনো জলাশয়ের পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা একটি অপরাধ।

‘আমরা প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করি। তবে এতো ব্যাপকভাবে পুকুর খনন চলছে, অনেক সময় রাতারাতিও পুকুর খনন হয়ে যায়। এটা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে এ অঞ্চলের পুকুর খননের প্রবণতার কথা জানানো হয়েছে এবং সেখানে পুকুর খননের বিরুদ্ধে একটি নির্বাহী আদেশ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় শিগগির এই আদেশ দিতে পারে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) রাজশাহী আঞ্চলিক সমন্বয়কারী তন্ময় সান্যাল বলেন, ভূমি ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনগুলোতে ভূমির ধরণ রূপান্তর করা নিষিদ্ধ।

তাছাড়াও, ২০১৩ সালের বাংলাদেশ পানি আইনে প্রাকৃতিক জলাশয়ের প্রবাহকে বাধা দেওয়া কঠোরভাবে নিষেধ করা আছে।

তিনি যোগ করেন, কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইনের খসড়া, যেখানে পরিষ্কারভাবে কৃষি জমি রূপান্তরে নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ আছে, সেটি এখনও পূর্ণতা পায়নি।

পুকুরের আগ্রাসন

গত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে নাটোর ও রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় অপেক্ষাকৃত শান্ত গ্রামীণ রাস্তাগুলোর নীরবতা ভেঙে সশব্দে চলছে একের পর এক ট্রাক্টর।

বিভিন্ন ফসলি জমিতে কৃষিযন্ত্রের পরিবর্তে চলছে পুকুর খননের এক্সক্যাভেটর।

এক্সক্যাভেটরে খনন করা পুকুরগুলোর মাটি ট্রাক্টরে করে বহন করা হচ্ছে ইটভাটায় বা অন্যত্র।

ট্রাক্টর থেকে মাটি ছিটকে পড়ছে রাস্তায়। মাটি শুকিয়ে ধুলা উড়ছে। সে ধুলা থেকে বাঁচতে কোথাও কোথাও এলাকাবাসী রাস্তায় পানি ছিটাচ্ছেন। অনেক নতুন পিচঢালা রাস্তা মাটি পরে নষ্ট হচ্ছে।

পুকুরে মাছ ধরা এবং জীবন্ত মাছ ট্রাকে করে পরিবহনের দৃশ্যও চোখে পড়ে।

তবে রাজশাহী অঞ্চলের বিরাজমান পানি সংকট ও মাটির নিচের পানির স্তরের সমস্যা প্রকট হওয়া সত্ত্বেও মাছ চাষের পুকুর ভর্তি পানি অবাক করার মতো। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, মাটির নিচের পানি উত্তোলন করেই পুকুরগুলো পূর্ণ রাখা হয়।

বোরো আবাদের মৌসুম ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে শুরু হলেও ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে নাটোরের বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর এবং রাজশাহীর পবা, মোহনপুর ও তানোরে দেখা গেছে অনেক কৃষক তখনও বোরো চারা রোপণ করতে পারেননি।

তারা জানান, জলাবদ্ধতার কারণে তাদের পানি নেমে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

জমিতে জমে থাকা পানি নিষ্কাশনে ব্যস্ত দেখা যায় তাদের। অনেকে জমিতে জমা কচুরিপানা পরিষ্কার করছিলেন। অনেকে চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন যে তারা এবার বোরো চাষ করতে পারছেন না জলাবদ্ধতার জন্য।

তারা জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী করেছেন অপরিকল্পিতভাবে খোঁড়া পুকুরগুলোকে।

কৃষকরা জানান, চলতি শতাব্দীর গোঁড়ার দিকে পুকুর খননের এই প্রবণতা শুরু হয়েছিল নাটোরের চলনবিল এলাকা থেকে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে এই প্রবণতা অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি বিভাগের বাইরেও ছড়িয়ে পরছে।

রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া, পাবনা এবং সিরাজগঞ্জের অন্তত ১৭টি উপজেলায় লাভজনক মাছ চাষের জন্য খনন করা পুকুরের সংখ্যা সর্বাধিক বৃদ্ধি পেয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০০১-০২ সাল থেকে রাজশাহী বিভাগে নতুন পুকুরের জমি বেড়েছে অন্তত ২৪ হাজার ৬৫১ হেক্টর।

একই হিসাবে আরও দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ সাল পর্যন্ত নয় বছরে প্রায় ১২ হাজার নতুন পুকুর খনন করা হয়েছে।

মৎস্য ও কৃষি কর্মকর্তারা বলেছেন, সরকারি এই তথ্যে প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, পুকুরের সঠিক কোনো জরিপ হয়নি। শহরগুলোতে পুকুর ভরাট হয়েছে এবং নদীতে অনেক চর জেগে ফসলের আবাদের আওতায় আনা হয়েছে।

তারা খসড়া হিসাব করে বলেন, ২০ বছরে পাঁচটি জেলায় নতুন খনন করা পুকুরের সংখ্যা হবে ৩৬ হাজারের বেশি। তবে কৃষক ও উন্নয়ন কর্মীরা মনে করেন এ সংখ্যা লাখ ছাড়াবে।

মাছের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য নতুন পুকুর খনন প্রয়োজন বলে জানান মৎস্য অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক মো. তোফাজউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, ‘তবে এর অর্থ এই নয় যে আমাদের তিন ফসলি জমি পুকুরে পরিণত করতে হবে। আমরা এটা নিরুৎসাহিত করি।’

ফসলি জমির রূপান্তর

রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘অপরিকল্পিত পুকুর খননে ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

স্থানীয় কৃষকরাও ডেইলি স্টারকে একই কথা বলেছেন।

এবছর ফসলের জমি স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধ থাকায় যাদের বোরো আবাদ করতে দেরী হয়েছে, পবার বিল নেপালপাড়ার নওশাদ আলী তাদের একজন।

তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে যারা ধান আবাদ করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সেসব কৃষক তাদের জমি পুকুরের জন্য ইজারা দিয়ে দিচ্ছেন। পুকুর খননকারীরা প্রতি বছরে বিঘা প্রতি ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা দেয়।

পুকুর খননের প্রাথমিক বছরগুলোতে, এক বিঘার জন্য কৃষকদের ৫০ হাজার টাকারও বেশি দেওয়া হয়েছিল।

‘ইজারার টাকা সহজেই আসে। কিন্তু ধান আবাদ করতে গেলে বিনিয়োগ লাগে, শ্রমও দিতে হয়। তারপরও লাভ যে হবে তার কোনো ভরসা থাকে না, বলেন তিনি।

নওশাদ বিলে তার তিন বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা তিন বছর আগে একটি পুকুর খননের জন্য ইজারা দিয়েছিলেন।

‘পুকুরের এক বিঘা থেকে আমি যে টাকা ঘরে বসে পাই তা তিন বিঘা জমিতে উৎপাদিত ধানের দামের অর্ধেক,’ যোগ করেন তিনি।

বড় বিলের কৃষক রহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ধানের দাম বেড়ে যাওয়াতে আমরা অনেকেই এবার ধান চাষে উৎসাহী হয়েছিলাম। কিন্তু ধান চাষের জন্য এখানে আর কোনো জমি বাকি নেই। কিছু জমি পুকুর হয়ে গেছে এবং বাকি জমিতে যে সময়ে আমরা আমন ধান ও সরিষা করব সেই পুরোটা সময় পানি বেঁধে থাকে।’

তিনি বলেন, পুকুর খননকারীরা ‘কৌশল’ করে বিলের নিচের কোণগুলোতে আগে পুকুর খনন করে। ফলে বিলের উঁচু জমি থেকে বর্ষার পানি নামতে পারে না। পরের বছরগুলোতে পুকুর সংলগ্ন জমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হলে সেসব জমির মালিকরা পরবর্তীতে পুকুরের জন্য ইজারা দিতে বাধ্য হয়।

রহিদুল বলেন, ‘কৃষক যখন দেখেন যে তাদের জমি তিন ফসলি থেকে এক ফসলি জমিতে পরিণত হয়ে গেছে বা অনাবাদি থাকছে, তখন তারা তাদের জমি পুকুর খননকারীদের কাছে ইজারা দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পান না।’

স্থানীয় কৃষকরা জারান, এ অঞ্চলের বিলগুলোতে খুব অল্প ফসলি জমিই পুকুরে রূপান্তর হওয়া বাকি আছে।

তারা যে কয়েকটি বিলের নাম বলেছেন সেগুলো হল- রাজশাহীর পবা, মোহনপুর ও দুর্গাপুর উপজেলার বড় বিল, বিল নেপালপাড়া, ফলিয়ার বিল, আনুলিয়া, পিয়ারপুর, ধুরইল, কান্তার, রাতোয়াল, পমপাড়া ও ফরিয়ার বিল এবং নাটোরের বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুরের চাকোলের বিল, বিল দহর ও চিনিডাঙ্গা বিল।

নাটোরের গুরুদাসপুরে ২৭টি মৌজার মধ্যে সাতটি মৌজার প্রায় সব ফসলের ক্ষেত পুকুরে পরিণত হয়েছে। মৌজাগুলো হল– মহারাজপুর, আচার্য্য চাপিলা, গজেন্দ্র চাপিলা, পাইকপাড়া, চাপিলা, ব্রিপাথুরিয়া এবং সাধুপাড়া।

মহারাজপুরের একজন স্থানীয় কৃষক জানিয়েছেন, বর্ষার সময় বাড়ি-ঘর পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে তাকে এবং আরও অনেককে বর্ষাকালে উঁচু অঞ্চলে বা শহরে চলে যেতে হয়।

‘যাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, তারা ঘরের মধ্যে মাচা বানিয়ে থাকেন,’ বলেন তিনি।

এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নে সরেজমিনে এই প্রতিবেদক দেখতে পান, সেখানকার নলখোলা-দিগরি বিলের এক কোনে একটি পুকুর ইতোমধ্যে খনন করা হয়েছে এবং চারটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে আরেকটি অপেক্ষাকৃত বড় পুকুর খননের কাজ চলছে।

স্থানীয়রা জানান, যেখানে পুকুর ইতোমধ্যেই খনন হয়ে গেছে সে জমিটি প্রায় ২৫ বিঘা। জলাবদ্ধতার কারণে গত পাঁচ বছর ধরে এটা পতিত পড়েছিল। অপরটি প্রায় ৩০ বিঘা। একমাস আগেও সেখানে ফসল হয়েছে।

তারা আরও জানিয়েছে, গত ১০ বছরে বিলের মধ্যে নলখোলা থেকে পারিলার দিকে চার কিলোমিটার এলাকায় ১০০টিরও বেশি পুকুর খনন করা হয়েছে।

যদিও অপরিকল্পিত পুকুরগুলো কৃষকদের জন্য হতাশার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তবে এর ভালো দিকটি হলো- মাছের চাহিদা বাড়তে থাকায় মাছ চাষিদের কাছে এগুলো লাভজনক।

মোহনপুরের মৎস্য চাষি আমজাদ হোসেন জানান, ১০ বিঘা জমির একটি পুকুরে ইজারা ও মাছ চাষ বাবদ ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে, প্রথম বছরেই অন্তত পাঁচ লাখ টাকা লাভ করা যায়।

তিনি বলেন, পুকুর খননে টাকা কমই লাগে। কারণ মাটি ব্যবসায়ীরাই খনন করে মাটি নিয়ে যায়।

জীবিকার ক্ষতি

মাইনুল ইসলাম জানান, পবা উপজেলার পশ্চিম বিলে তাদের চার ভাইয়ের মালিকানাধীন চার বিঘা জমিতে বছরে তিন বা বেশি ফসল ফলিয়েই তারা ও তাদের পরিবার চলতো।

তিন বছর আগে তাদের পাশের জমিতে পুকুর খনন হওয়ার পর থেকে তাদের জমি জলাবদ্ধ থাকে। এখন সেখানে বোরো ধান ছাড়া আর কোনো ফসল হয় না। পুকুর বাড়তে থাকায় বোরো আবাদেও দেরী হয়।

তিনি বলেন, তিন ফসলি জমি এক ফসলি হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

‘জলাবদ্ধতার সময় কাজ খুঁজতে আমরা চার ভাই শহরে চলে যাই। ফসল না হলে নিজে খাব কী, পরিবারকে খাওয়াব কী? নিজের জমিতে কাজ নেই, তাই বাঁচার জন্য আমাকে অন্যের দুয়ারে শ্রমিকের কাজ খুঁজতে হয়,’ বলেন তিনি।

ফসলের জমি কমে যাওয়ায় কৃষি শ্রমিকরা গ্রামে কাজ হারাচ্ছেন। পুকুরে ফসলের জমির মত বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হয় না।

মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াতে প্রায় ৩০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন। অপরদিকে, একটি পুকুরে দুজন তত্ত্বাবধায়কই যথেষ্ট। সে পুকুর ১০ বিঘা জমিতে হোক আর ৫০ বিঘা জমিতে।’

পবা উপজেলার পারিলা গ্রামের হাবিবুর রহমান জানান, কৃষি শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়ছেন এবং তাদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে শহরেও কাজ পাওয়া যায় না।

শত শত কৃষি শ্রমিকদের একজন হাবিবুর। এই শ্রমিকরা শীত, বৃষ্টি এবং গ্রীষ্মের তাপ উপেক্ষা করে সপ্তাহে সাত দিন রাজশাহী শহরে ছুটে যান কাজের সন্ধানে।

সম্প্রতি এক সকালে রাজশাহী শহরের কামরুজ্জামান চত্বরে এই প্রতিবেদক হাবিবুরের সঙ্গে কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘সপ্তাহে দু-তিন দিন কাজ পাই। কখনো কখনো কোনো কাজ ছাড়াই দুই সপ্তাহ চলে যায়। আজ কোনো কাজ পেলাম না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে সপ্তাহে কাজ পাই না সে সপ্তাহে পরিবার নিয়ে আধ-পেট খেয়ে থাকি।’

হাবিবুরের মতো আরও অনেকে বলেন, অপরিকল্পিত পুকুর গ্রামগুলোতে যেভাবে সমস্যা বাড়াচ্ছে এখনি কোন ব্যবস্থা না নিলে নিকট ভবিষ্যতে কী হবে তা ভেবে তারা আতঙ্কিত।

সূত্র: ডেইলি স্টার

ডেইলি/ এস


  • 32
    Shares

এই রকম আরও খবর

সর্বশেষ খবর

বিশেষ খবর