আজ- বুধবার, ১২ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২৯শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মমতা ম্যাজিকেই বাজিমাত! কোন রসায়নে এল ‘ল্যান্ডস্লাইড ভিক্ট্রি’

  • 12
    Shares

।। ডেস্ক রিপোর্ট।।

“খেলা হবে” বনাম ” আসল পরিবর্তন”। বাংলা কিন্তু নিজের মেয়েকেই বেছে নিল। কারণ, ম্যাজিক ফিগার ১৪৮ এর থেকে অনেক অনেক এগিয়ে দৌড় শেষ করল তৃণমূল কংগ্রেস। আর ” সোনার বাংলা” গড়ার কথা বলে তিন সংখ্যায় পৌঁছন হল না বিজেপির।
চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগেই তাই শুরু হয়েছে কারণ সন্ধান। নানা মহল থেকে উড়ে আসছে নানান মন্তব্য। ভাঙ্গা পায়ে কোন রসায়নে বাজিমাত করলেন তৃণমূল নেত্রী? জেনে নিন এক ঝলকে
১) ধর্মীয় মেরুকরণ বনাম উন্নয়ন তাস। একদিকে বারবার মোদি-শাহের সভা। বিজেপির একাধিক নেতা তাদের বক্তব্যে হিন্দুত্বের কথা বলেছেন। এমনকি মতুয়া ভোট টানতে উঠেছে সি এ এ প্রসঙ্গ। অন্যদিকে নন্দীগ্রামের প্রচারে লাগাতার মমতা ব্যানার্জিকে শুনতে হয়েছে ” বেগম” সম্বোধন। উল্টোদিকে প্রথম থেকেই তৃণমূল নেত্রীর প্রচারে শুধুই এসেছে উন্নয়ন প্রসঙ্গ। এই সরকারের ১০ বছর শাসনকালে সরকারি প্রকল্পের সুবিধে এবং রাজ্যে উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে। দেখা গেল মানুষ ধর্ম নয় বেছে নিলেন উন্নয়নকেই।
২) মমতার প্রকল্পের নাম ছিল ” দুয়ারে সরকার”। বিজেপি শিবির পাল্টা ব্যঙ্গ করে নাম দিয়েছিল “যমের দুয়ারে সরকার”। কিন্তু সকলের জন্য স্বাস্থ্যসাথী কয়েক গোলে হারিয়ে দিল আয়ুষ্মান ভারত কে। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, যুবস্রী কেই বেছে নিলেন বাংলার মানুষ। খুব সহজ কথায়, অনিশ্চিত সোনার বাংলা নয়। বরং বাংলা হাতে তুলে নিল নিশ্চিত, পরিচিত এবং শক্তপোক্ত সরকারের সম্ভাবনাকে।
৩) স্লোগান ছিল, ” আগামীর দিন দিচ্ছে ডাক/ মেয়ের কাছেই বাংলা থাক”। পাল্টা নরেন্দ্র মোদির “দিদি, ও দিদি” সম্বোধন। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সভায় বারবার বাংলার মা-বোনেদের উদ্দেশ্য করে বক্তব্য রেখেছেন। হাতা খুন্তি নিয়ে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছেন। এমনকি স্বাস্থ্য সাথীর উপভোক্তা হিসেবে পরিবারের মহিলাদের নির্দিষ্ট করা হয়েছে। দেখা গেল, একদিকে যদি সংখ্যালঘু ভোট মমতার বাক্সে উপুড় হয়ে পড়েছে অন্যদিকে বাংলার মহিলারা হাত ভরে ভোট দিয়েছেন তৃণমূলের পক্ষে। পাশাপাশি, পায়ে আঘাত নিয়েও এক মহিলার মোটা রাজ্যজুড়ে এভাবে দাপিয়ে লড়াই কোথাও একটা বাংলার মেয়েদের মন কেড়েছে বলেই রাজনৈতিক মহলের মত।
৪) অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। পেট্রোল, ডিজেল থেকে রান্নার গ্যাস। ভোজ্য তেল থেকে কাঁচা সবজি, ডাল। হু হু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে। রান্নাঘরে আগুন রাজ্যের মহিলাদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে আর এই ক্ষোভের প্রভাব পড়েছে ভোট বাক্সে। এমনটাই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
৫) ভোটের আগে শুভেন্দু অধিকারী , রাজিব ব্যানার্জি , বৈশালী ডালমিয়া থেকে জিতেন্দ্র তিওয়ারি। রুদ্রনীল ঘোষ। শিবির বদলে ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন এরা সবাই। কখনও “গদ্দার”, কখনও আবার “মীরজাফর” বিশেষণে ভূষিত হয়েছেন এরা। পাল্টা, দলে থেকে কাজ করতে না পারার অভিযোগ তুলেছিলেন এরা সবাই। কিন্তু আখেরে দেখা গেল, এই দল বদল কে খুব ভাল ভাবে নিলেন না বাংলার মানুষ। ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেলেন রাজনৈতিক ভাবে। ব্যতিক্রম শুভেন্দু অধিকারীএবং মুকুল রায়। মুকুল যদিও বিধানসভা নির্বাচনের আগে নয় বরং ২০১৮ পঞ্চায়েত ভোটের আগেই দলত্যাগ করেছিলেন।
৬) করোনা পরিস্থিতি। বিশ্লেষকরা বলছেন প্রথম চার দফা ভোটের পরেই রাজ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আছড়ে পড়ে। তৃণমূল কংগ্রেস প্রথম দাবি তোলে বাকি চার পর্যায়ের ভোট যেন একসঙ্গে করা হয়। বাম, কংগ্রেস ও এতে সহমত ছিল। কিন্তু আপত্তি তোলে বিজেপি। নির্বাচন কমিশনে গিয়ে স্বপন দাশগুপ্ত, শিশির বাজোরিয়ারা বলেন, চার পর্যায়ের নির্বাচন একদফায় হলে নির্দল অথবা ছোট দলের প্রার্থীরা প্রচার এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। দেখা গেল, শেষ চার পর্যায়ের নির্বাচনে বাংলার মানুষের আবেগ কিন্তু ঘাসফুল শিবিরের দিকে গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কথা, “মানুষের জীবন আগে নাকি ভোট আগে” অনেক বেশি সংবেদনশীল মনে হয়েছে সাধারণ মানুষের কাছে। এর ফল পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।
৭) বিজেপি নেতাদের বেলাগাম মন্তব্য। কোচবিহারের শীতলকুচি তে যখন অধাসেনার গুলিতে ৪ জনের মৃত্যু হল তখন কেন্দ্রীয় বাহিনীর অতি সক্রিয়তা নিয়ে সব মহলে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। ব্যতিক্রম বিজেপি নেতারা। কখনও দিলীপ ঘোষ বলেন,”বেশি বাড়াবাড়ি করলে শীতলকুচি হয়ে যাবে”। আবার সায়ন্তন বসু বলেন, ” কেন্দ্রীয় বাহিনী যেন পায়ে নয় সরাসরি বুকে গুলি করে”। আবার কখনও তৃণমূল নেত্রীর পায়ে আঘাত সম্পর্কে বিজেপি রাজ্য সভাপতির বারমুডা সংক্রান্ত মন্তব্য বিতর্কের ঝড় তোলে। এই সবকিছুই দিনের শেষে গেরুয়া শিবির কে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে দিল না।
৮) ভোট কাটাকাটি কি তৃণমুলকেই সুবিধে করে দিল? বাম ভোট রামে পড়ছে। এই অভিযোগ আগে থেকেই ছিল। কিন্তু সরকার গড়ার প্রশ্নে রাজনৈতিক মেরুকরণ এর যে ভোট তা সরাসরি তৃণমূলে গেছে। আবার এলাকার নেতা দল বদল করলেও এলাকার মানুষ আস্থা রেখেছেন পুরনো শিবিরে।
ইদানীংকালের মধ্যে নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ ভোটের প্রচারে রেকর্ডসংখ্যক সময় এই রাজ্যে এসেছেন। বারবার এসেছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সেনাকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছে বিজেপি এমন অভিযোগও উঠেছে একাধিকবার। তবু সবকিছুর পরে তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিপুল সংখ্যায় জয় আগামী দিনে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, সর্ব ভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে যে একটা অন্য সমীকরণ তৈরি করবে তা বলা যেতেই পারে। যার মধ্যমণি হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জির

ডেইলি/ এস


  • 12
    Shares

এই রকম আরও খবর

সর্বশেষ খবর

বিশেষ খবর