আজ- মঙ্গলবার, ২৭শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১২ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মাটি খাওয়া মানুষ


ডেইলি ডেস্ক: বেশি করে মাটি খান। মাটি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। কি, বিশ্বাস হচ্ছে না? বিশ্বাস না হওয়ার অবশ্য হাজারটা কারণ রয়েছে। তারপরও কথাটা সত্যি, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই  কিছু কিছু মানুষ রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করতে প্রকৃতির ওপর খুব বেশি নির্ভর করে থাকেন। এই যেমন প্রকৃতির উপর নির্ভর করে এখনো অনেক মানুষ করোনার টিকা নিতে চায়না। ভরসা করে প্রকৃতি। অনেকটা তেমনি। আমাদের দেশে মাঝে মধ্যে অদ্ভূত মাটি খাওয়া পাগল মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। এটি নেহায়েতই বিকারগ্রস্থ মতিচ্ছিন্ন পাগলের ব্যাপার হতে পারে বটে। তবে অনেক ভালো, সুস্থ-স্বাভবিক মানুষকেও হরহামেশা মাটি খেতে দেখা যায়। তাই মানুষের মাটি খাওয়ার ব্যাপারটিকে পাগলামো বলে উড়িয়ে দেওয়ার কারণ নেই। ইতিহাস, ভূগোল ও বিজ্ঞানে মাটি খাওয়ার ব্যাপ্তি অনেক।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে দেশে বিস্তর পটভূমিতে মাটি খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। এই মাটি খাওয়া বিষয়টি শারীরিক অসুস্থ্তার মুক্তির সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ আরোগ্য ও উপকারের জন্যই প্রচলিত এই মাটি ভক্ষণ। চীন, জিম্বাবুইয়ে আর যুক্তরাষ্ট্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে নমুনা নিয়ে মাটি খাওয়ার একই উপকারী ফলফল পাওয়া গেছে। জানা যায়, রোমানরা মাটি ও ছাগলের রক্ত মিশিয়ে ওষুধের ট্যাবলেট তৈরি করতো। গত শতাব্দীতেও দেখা যায়, জার্মানিরা খুব মিহি কাদার আস্তরণ রুটির উপর মাখনের পরিবর্তে ব্যবহার করে খেতো।

বর্তমান পরীক্ষা-নীরিক্ষায় যে মাটি খাওয়ার নমুনাগুলো ব্যবহৃত হয়েছে, তার একটি এসেছে চীনের হুনাল প্রদেশ থেকে। সেখানে হালকা হলুদ মাটি, পঞ্চাশের দশকেও যাকে দূর্ভিক্ষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো। দ্বিতীয় নমুনাটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার স্টোক কান্ট্রি থেকে। সেখানে এ মাটি স্বাস্থ্য রক্ষার্থে খাওয়া হয়। তৃতীয়টি এসেছে জিম্বাবুইয়ের লাল মাটির উঁই ডিবি থেকে। ওখানে পেটের পীড়ার জন্য এটি খাওয়া হয়।

পরীক্ষায় দেখা গেছে, চীনের নমুনাটিতে রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে লোহা, ক্যালশিয়াম, ভ্যানডিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ আর পটাশিয়াম। দুর্ভিক্ষের সময় শরীরে এসব পদার্থের অভাব ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের নমুনাটিতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় আয়োডিন আর লৌহ। যা শিশু ও মহিলাদের বেশি করে দরকার। অনেক খাবারে এগুলো যথেষ্ট থাকে না। জিম্বাবুইয়ের নমুনাটিতে বেশি দেখা যায় কেওলিনাইট। ডায়রিয়া সারানোর জন্য বাণিজ্যিকভাবে যে ক্যাওপেকটেট পাওয়া যায় তার প্রধান উপাদানই হচ্ছে এই কেওলিনাইট। সেখানকার মানুষ পেট ফাঁপা, পেট গরমে উঁই-ঢিবির মাটি খেয়ে যে আরাম পায় তাতে আমাদের আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

মাদাগাস্কারের খনির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের কথাই ধরুন। ওরা মাটি খায় টনিক হিসেবে। গর্ভবতী মহিলারা সুস্বাস্থ্যের আশায় প্রতিদিন ভোরে উঠে চীনামাটি বা সাদা মাটি খেয়ে থাকে। কোন কোন দেশে ইটের মাটি, পোড়া মাটি খাওয়ার রেওয়াজও চালু রয়েছে। চিকিৎসকরা অবশ্য এ বিষয়ে সাবধান করলেও কে শুনে কার কথা? বিজ্ঞানীরা তাই হালে গবেষণা করে দেখেছেন, চীন জিম্বাবুইয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রের যেসব মানুষ মাটি খায়, তারা সাধারণ আর দশজনের তুলনায় স্বাস্থ্যগতভাবে অনেক ভালো রয়েছে। ওরা যেসব মাটি খায়, গবেষকরা তা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে তাতে শরীরের উপকারী অনেক রাসায়নিক পদার্থ পেয়েছেন। বিগত দিনগুলোতে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরেন্টোর বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন। সব তথ্য উপাত্ত আর প্রমাণের উপর নির্ভর করে ব্রিটেন বাসীদের মাঝে মধ্যে মাটি খাবার পরামর্শ দিয়েছে দ্য সায়েন্টিষ্ট ম্যাগাজিন।

আর তাই বেশি করে মাটি খান। আর হ্যাঁ, মনে রাখবেন- এখন থেকে পত্রিকায়, ফেসবুকে, ইউটিউবে মাটি খেকো মানুষের খবর, ভিডিও দেখলে ভিন্নরকম পাগল ভাবার আর কোন কারণ নেই।

শেখ আনোয়ার: বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক। 


এই রকম আরও খবর

সর্বশেষ খবর

বিশেষ খবর