আজ- বুধবার, ২৩শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

মুখে দিলেই রসে ভরে যায় দিনাজপুরের লিচু


                       

।। দিনাজপুর প্রতিনিধি।।

দিনাজপুরের লিচু বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের অন্য এলাকার লিচুর চেয়ে আলাদা। গোলাপি রঙের লিচু মুখে দিলেই ঘ্রাণ আর মিষ্টি রসে মুখ ভরে যায়। লিচু সুস্বাদু ও আগাম জাতের হওয়ায় চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। প্রতিটি লিচুই গোলাপি রঙের, শাঁস মোটা ও রসে ভরপুর। খেতে অনেক সুস্বাদু ও গন্ধ অতুলনীয়।

দিনাজপুরের লিচুতে এখন মেতে উঠেছে পুরো জেলা। লিচু চাষিদের দম ফেলার সময় নেই। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লিচু বাগানে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। লিচু পাড়া, বাছাই করা, ৫০টি করে লিচুর থোকা তৈরি করা , ভ্যান বোঝাই করে লিচু বাজারে নিয়ে যাওয়া, লিচুর খাঁচা বোঝাই করে ট্রাকে তোলা, দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো, সব মিলিয়ে চারদিকে যেন এক উৎসব।

দিনাজপুর অস্থায়ী বিশাল লিচু বাজারে পুরো দমে লিচু বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে এ বছর তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে লিচুর ফলন কমেছে অন্তত ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে গত কয়েক দিনের প্রচণ্ড রোদ আর কিছু সময় বৃষ্টির কারণে লিচু ফেটে ঝড়ে গেছে বলে কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

দিনাজপুরে চায়না দুই, চায়না থ্রি, বেদানা, বোম্বাই, মাদ্রাজি, কাঁঠালি জাতের লিচুর চাষ হয়। দিনাজপুরের সব জায়গায় কমবেশি লিচুর চাষ হয়। সবচেয়ে বেশি চাষ হয় সদর উপজেলার মাসিমপুর, ঘুঘুডাঙ্গা, বিরলের মাধববাটি, করলা, রবিপুর, মহেশপুর, বটহাট, চিরিরবন্দরের সাইতারা, মাদারডাঙ্গা, অমরপুর ও খানসামার শাহপাড়া, আঙ্কারপুর, দহুশুর গ্রামে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দিনাজপুরে ৬ হাজার ৫৪৬ হেক্টর জমিতে লিচু বাগান রয়েছে ৫ হাজার ৪১৮টি। বসতবাড়ির উঠান ও বাগান মিলিয়ে জেলায় লিচু গাছ আছে সাত লাখের বেশি। গত মৌসুমে উৎপাদিত হয়েছিল ৩৫ থেকে ৩৮ হাজার মেট্রিক টন লিচু, যা থেকে আয় হয় ৪০০ কোটি টাকা।

করোনা পরিস্থিতিতে জনসমাগম এড়াতে গত বছরের মতো এবারো শহরের গোর এ শহীদ ময়দানে বসেছে লিচুর পাইকারি ও খুচরা বাজার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শতাধিক লিচুর পাইকার এসেছেন। তারা স্থানীয় লিচু চাষিদের কাছ থেকে লিচু ক্রয় করে দেশের রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাচ্ছেন। এছাড়াও কুরিয়ার সার্ভিস যোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনাজপুর থেকে প্রিয়জন আত্মীয় স্বজনদের মাঝে লিচু পাঠানো হচ্ছে।

জেলায় নানা জাতের লিচুর চাষ হলেও এখন বাজারে এসেছে মাদ্রাজি, বেদানা ও বোম্বাই জাতের লিচু। আরো কিছু দিন পর চায়না দুই, চায়না থ্রি, ও কাঁঠালি জাতের লিচু পাওয়া যাবে। বর্তমানে প্রতি হাজার মাদ্রাজি জাতের লিচু বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। প্রতি হাজার বেদানা জাতের লিচু বিক্রি হচ্ছে সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রতি হাজার বোম্বাই লিচু বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত।

অন্যদিকে মাদ্রাজি লিচু খুচরা বিক্রি হচ্ছে প্রতি ১০০টি লিচু ২০০ থেকে ৩২০ টাকা। বেদানা লিচু বিক্রি হচ্ছে প্রতি ১০০টি সাড়ে ৫০০-৭০০ টাকা। আর বোম্বাই লিচু বিক্রি হচ্ছে ১০০ টি লিচু ৩০০-৪৫০ টাকায়।

চিরিরবন্দর সাতনালা লিচু চাষি মো. আব্দুল রহমান জানান, দিনে বিভিন্ন পাখি ও কিশোর-কিশোরীদের অত্যাচার এবং রাতে বাদুরের উপদ্রব থেকে লিচু রক্ষা করতে দিনরাত তাদের বাগান পাহারা দিতে হচ্ছে।

বিরলের রবিপুর গ্রামের লিচু চাষি আনিছুর রহমান জানান, ২৫ একর জমিতে ৮০০ গাছ নিয়ে লিচু বাগান তার। গত বছরের তুলনায় এবার ৬০ শতাংশ গাছে মুকুলই আসেনি। তবে গত বছর যেখানে মাদ্রাজি লিচু ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার শুরুতেই সেই লিচু প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে।

সদর উপজেলার মাসিমপুর এলাকার লিচু চাষি আকবর আলী বলেন, ৫টি লিচু বাগান আছে, ২০০টি গাছ রয়েছে। সব মিলিয়ে বাগানে খরচ হয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা। কিন্তু ফল এসেছে ৮০ টি গাছে, তাও আবার ফলন কম। লিচুর আকারও এবার ছোট। এবার লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠবে না।

মাশিমপুরের লিচু চাষি গোলাম রব্বানী বলেন, আমরা প্রায় ১৫ দিন ধরে খুবই ব্যস্ত সময় পার করছি। লিচু বাছাই করে ৫০টি করে লিচু নিয়ে একটি করে থোকা তৈরি করার জন্য নারী ও পুরুষ শ্রমিক কাজ করছে। এদের প্রত্যেককে প্রতিদিন ১৫০ টাকা করে হাজিরা দিতে হয়। আরো লিচু দিতে হয়।

চাঁদপুর থেকে লিচু কিনতে আসা রবিউল ইসলাম বলেন, এ বছর লিচুর চাহিদা অনেক বেশি। সে তুলনায় বাজারে লিচু নেই।

ঢাকা থেকে আসা লিচু ব্যবসায়ী মোবারক আলী বলেন, প্রতি বছর আমরা লিচুর সময়ে লিচু ব্যবসা করার জন্য আসি। এ বছর প্রতিদিনই লিচু দাম বাড়ছে। কারণ এ বছর লিচুর ফলন কম চাহিদা বেশি তাই বেশি দামে লিচু ক্রয় করতে হচ্ছে। ভোক্তারাও বেশি দামে ক্রয় করে খেতে হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক প্রদীপ কুমার গুহ বলেন, করোনা পরিস্থিতি এড়াতে লিচুর বাজার এবারো উন্মুক্ত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এবার লিচুর ফলন কম হলেও অর্থনৈতিক বিনিময়ে কোনো ঘাটতি হবে না, চাষিরা ভালো দাম পাবেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় অনাবৃষ্টির কারণে মাটি থেকে গাছের খাদ্য সংগ্রহ বিঘ্নিত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারই লিচুর এমন ফলন বিপর্যয় হয়েছে। সামনের মৌসুমগুলোতে লিচুর ফলন বিপর্যয় রক্ষায় কৃষকদের নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হবে।

ডেইলি/ এস


এই রকম আরও খবর

সর্বশেষ খবর

বিশেষ খবর