আজ- বুধবার, ২৩শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

রাজশাহীতে হিটশকে ক্ষতি ১০ শতাংশ ধান


নিজস্ব প্রতিবেদক: অতিরিক্ত গরমে মানুষ যেমন হিটস্ট্রোক করে; তীব্র তাপদাহে ধানগাছও এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়,আর সেটাকেই ধানের হিটশক বা হিট ইনজুরি বলা হয়। রাজশাহী অঞ্চলে গত মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে বিরাজ করছে শুষ্ক বাতাস। তাপমাত্রা রয়েছে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে। আর তাতেই হিটশকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার ২৮ হেক্টর জমির ধান। এতে করে বোরো আবাদের ন্যূনতম ক্ষতি হয় ৫ থেকে ১০ শতাংশের কাছাকাছি। এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়া ও তীব্র তাপদাহে শুকিয়ে যাচ্ছে ধানগাছ। ধানের শীষগুলো সাদা হয়ে যাচ্ছে। আর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কপাল পুড়ছে কৃষকদের। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এ পরিস্থিতিকে কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ধান গবেষকরা।

রাজশাহীতে মোট ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। গত রোববারের (৪ এপ্রিল) বৃষ্টি ও আদ্রতাহীন শুষ্ক ঝড়ে ২৮ হেক্টর জমির বোরো ধান হিটশকে পুড়েছে। হেক্টর প্রতি ৬ মেট্রিকটন ধান হিসেবে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬৮ মেট্রিকটন। এখানেই শেষ নয়, ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে রাজশাহীর আবহাওয়া অফিসসূত্রে জানা গেছে, ৪ এপ্রিল বিকেল চারটার পর থেকে হঠাৎ গরম বাতাস বইতে শুরু করে। তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপর ছিল। এছাড়াও গত দু-সপ্তাহ ধরে প্রায়ই দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে রাজশাহীতে। যা ৩৫ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে উঠানামা করেছে। ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আর্দ্রতা না থাকায় ধানের এমন ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

জানা গেছে, গত রোববার (৪ এপ্রিল) রাজশাহী, কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকা এবং নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহ জেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় হিটশকে বোরো ধানের শতকরা ৫ শতাংশেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. তাহমিদ হোসেন আনছারী বলেন, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া কিংবা কমে যাওয়া, দুই কারনেই হিটশক বা হিট ইনজুরি হয়ে থাকে। তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার উপরে থাকলে ধানে হিটশক হয়। হিটশকে ধানের ফলনের প্রাথমিক পর্যায়ে বেশি ক্ষতি হয়।

তিনি আরও বলেন, ঐদিন কিংবা তার একদিন আগে যেসব ধান পরাগায়ন হচ্ছিল, সেই ধানের শীষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরাগায়ন করতে পারেনি এবং ফ্লাওয়ারিং স্টেজ চলার কারণে ওইসব ধানের শীষ থেকে পানি বেরিয়ে গেছে। সেই সাথে বৃষ্টি না হওয়া ও পরের দিন রোদ উঠার পর শীষগুলো সাদা আকার ধারণ করে শুকিয়ে যায়।

ঝড়ের দিন ফুল ফোটা অবস্থায় থাকা জমির ৫ থেকে ১০ শতাংশ ধান প্রথমে সাদা ও পরবর্তীতে কালো বর্ণ ধারণ করে এবং এরপর চিটা হয়ে গেছে। তাছাড়া ঝড়ের কারনে পাতায় পাতায় ঘর্ষণে পাতা ফেটে গিয়ে ক্ষতস্থান দিয়ে ব্যকটেরিয়া প্রবেশ করে বিএলবি বা পাতাপোড়া রোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাতার অগ্রভাগ ও কিনারা পুড়ে যাওয়ার মত হয়ে খড়ের মত রং ধারণ করেছে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান ড. মো. ফজলুল ইসলাম বলেন, এবার দীর্ঘ সময় বৃষ্টির দেখা নেই। আবহাওয়া অত্যন্ত রুক্ষ। ৪ এপ্রিল সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ছাড়াই ঝড় শুরু হয়। সেদিন বাতাস ছিল অতিরিক্ত গরম। ফলে ঐদিন যেসব ধানের শীষ বের হয়েছিল সেগুলোর ফুল ঝরে যায়।

তিনি বলেন, ওই দিন বাতাসের গতির সাথে আর্দ্রতার মিল না থাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম অনুভূত হয়েছে। এতে ডিহাইড্রেশন প্রক্রিয়ায় সদ্য ফোটা শীষ থেকে পানি বের হয়ে গেছে, এবং শীষ শুকিয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে এমনটা হত না। রাজশাহীতে ক্ষতির পরিমাণটা কম হয়েছে। হাওর অঞ্চলে হিটশকের বেশি প্রভাব পড়েছে বলে জানান ঐ কর্মকর্তা।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. আউয়াল বলেন, জেলায় এবার ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। ৪ এপ্রিল ঘন্টাব্যাপী বৃষ্টিহীন ঝড়ো বাতাস প্রবাহিত হয়েছে। তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় ও বাতাসে আর্দ্রতা না থাকায় বোরো ধানের ক্ষেতের শীষ মরে গেছে।

তিনি আরও বলেন, জলীয় বাষ্প কম থাকলে আমরা যে তাপমাত্রা রেকর্ড করি না কেন, এর চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রা অনুভূত হবে। তখন মনে হয় লু-হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। সেদিন মূলত এ ব্যাপারটা ঘটেছিল। এখন পর্যন্ত ২৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধান হিটশকে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। হেক্টর প্রতি ৬ মেট্রিকটন ধান হিসেবে ১৬৮ মেট্রিকটন ধানের ক্ষতিসাধন হয়েছে।

রাজশাহী সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, এ অঞ্চলের ধান চাষীদের কোন সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই। ধানের ফ্লাওয়ারিং স্টেজ আসার আগে এবং এর পরবর্তী ১০ থেকে ১২ দিন জমিতে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি পানি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এখানকার কৃষকরা সেই মোতাবেক ধান চাষ করে আসছেন। যাদের সেচ দেওয়ার পরিস্থিতি বা সুযোগ আছে তারা দেবেন। আর যাদের সেই সুযোগ নেই সেটা আলাদা ব্যাপার।

ধানের হিটশক বা তীব্র তাপমাত্রায় চাষীদের করণীয় বিষয়ে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট জানায়, ধানের দানা শক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত জমিতে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি পানি ধরে রাখতে হবে। ধানের অগ্রভাগ বা পাতাপোড়া রোগ দেখা দিলে প্রতি ৫ শতাংশ জমিতে থিওভিট ও এমওপি ৬০ গ্রাম, ২০ গ্রাম দস্তা বা জিঙ্ক ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। সেই সাথে প্রতি বিঘা জমিতে ৫ কেজি পটাশ দিলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে। ধানে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিলে ট্রাইসাক্লাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন প্রয়োগ করলে ধানের ব্লাস্ট প্রতিরোধ করা যায়।

 

ডেইলি/ এইচ


এই রকম আরও খবর

সর্বশেষ খবর

বিশেষ খবর