আজ- বুধবার, ২৩শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

রামেক হাসপাতালে মূল চাহিদা অক্সিজেন


।।  ডেস্ক রিপোর্ট।।

ট্রলিতে বাবার লাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন কামাল হোসেন। আহাজারি করছিলেন আর বলছিলেন, ‘আর পাঁচটা মিনিট আগে আসলে আব্বা হয়ত বেঁচে যেত। সময়মত গ্যাস (অক্সিজেন) পেলে আমার আব্বা বেঁচে যেত।’ কামাল হোসেনের বাড়ি নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বীরডাউন গ্রামে।

গত শনিবার বিকাল ৫টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত ২২ নম্বর ওয়ার্ডের সামনে ট্রলিতে বাবার লাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। কামাল জানালেন, তাঁর বাবার শ্বাসকষ্ট ছিল। তাই নিয়ামতপুর থেকে সরাসরি রামেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এরপর তাঁর বাবাকে ২২ নম্বর ওয়ার্ডে দেয়া হয়। ওয়ার্ডে নিয়ে কেবল অক্সিজেন দেয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। তখনই মারা যান তাঁর বাবা। আর একটু সময় পেলে হয়ত তাঁর বাবাকে বাঁচানো যেত।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কিংবা উপসর্গ নিয়ে যাঁরা হাসপাতালে আসছেন এখন সবার অক্সিজেন লাগছে। হাসপাতালে যে কয়টি ওয়ার্ডে পাইপলাইনের মাধ্যমে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই ব্যবস্থা ছিল, সেগুলো রোগীতে ভর্তি। এখন বারান্দা এবং বিছানায় রোগী রাখার প্রস্তুতি চলছে। বেড ছাড়াও এখানে অক্সিজেন সরবরাহ করা যায় কিনা তা নিয়েও পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘করোনার প্রথম ধাক্কা এবং এখনকার মধ্যে পার্থক্য দেখছি। আগে সব রোগীর অক্সিজেনের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু এখন অন্তত ভর্তির সময় শতভাগ রোগীর অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে। দু’একদিন থাকার পর হয়ত আর লাগছে না। কিন্তু শুরুতেই যে সবার অক্সিজেন লাগছে এটা সত্যিই ভীতিকর। এ রকম রোগীর চাপও বাড়ছে।’

রামেক হাসপাতালের মোট এক হাজার ২০০ শয্যার মধ্যে ২৩২টি করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত। মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত করোনা ইউনিটে মোট ২১৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে ৯১ জন ছিলেন করোনা পজিটিভ। বাকিরা ছিলেন করোনার উপসর্গ নিয়ে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, করোনা ওয়ার্ডে রোগীর চাপ বেশি বলে সব রোগীকে ভর্তিও নেয়া হচ্ছে না। যাঁদের অক্সিজেনের মাত্রা কম, কেবল তাঁদেরই ভর্তি করা হচ্ছে। অন্যদের বাড়িতেই চিকিৎসা নিতে বলা হচ্ছে। সুতরাং হাসপাতালে সব রোগীকেই অক্সিজেন নিতে দেখা যাচ্ছে। আর এটা দেখে উদ্বীগ্ন হয়ে যাচ্ছেন স্বজনেরা। উন্নত চিকিৎসার আশায় তাঁরা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) সিরিয়াল দিচ্ছেন।

রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগের মালি মো. রানার মা মজিজন বিবি হাসপাতালের আইসিইউতে ছিলেন। শনিবার সন্ধ্যায় রানা জানান, তিন দিন অপেক্ষার পর তাঁর মা আইসিইউ পেয়েছেন। এই তিন দিন ওয়ার্ডে থাকা অবস্থায় প্রায় ২৫ হাজার টাকার ওষুধ-ইনজেকশন কিনেছেন। কিন্তু আইসিইউ না পাওয়ার কারণে ভরসা পাচ্ছিলেন না। শনিবারই তাঁর মা আইসিইউ পেয়েছেন। তবে সোমবার দিবাগত রাতে চিকিকৎসাধীন অবস্থায় রানার মা মারা গেছেন।

হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস বলেন, আরও পাঁচটা ভেন্টিলেটর পাওয়া গেলে পাঁচটা আইসিইউ বেড বাড়ানো যাবে। সে কারণে ঢাকায় পাঁচটা ভেন্টিলেটরের চাহিদা দেয়া হয়েছে। রোগীর এত চাপ যে এখন বেডই শেষ হয়ে এসেছে। এ কারণে এক নম্বর ওয়ার্ডটিকেও করোনা রোগীদের জন্য ছেড়ে দেয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই ওয়ার্ডটিতে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই ব্যবস্থা আছে।

আর হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানিয়েছেন, শুধু এক নম্বর ওয়ার্ড দিয়েই রোগীর বাড়তি চাপ সামাল দেয়া যাবে না। তাই করোনা ওয়ার্ডগুলোর মেঝে এবং বারান্দাতেও রোগী রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। কিন্তু বারান্দায় আবার সরবরাহ করা অক্সিজেন দেয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে না। তাঁদের সিলিন্ডারের অক্সিজেন দিতে হবে। এই অক্সিজেনের চেয়ে সেন্ট্রাল লাইনের অক্সিজেনেই রোগীদের বেশি সুবিধা হয়। তারপরও উপায় নেই বলে এটা করতে হবে।

তিনি বলেন, করোনা ও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে যাঁরা ভর্তি হচ্ছেন তাঁদের প্রত্যেকের অক্সিজেন লাগছে। প্রতিদিন এখানে চার হাজার লিটারের মত অক্সিজেন লাগছে। অক্সিজেনের কোন ঘাটতি নেই। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে- আরও অক্সিজেন লাগলে আরও দেবে। কিন্তু রোগী রাখার জায়গা হচ্ছে না।


এই রকম আরও খবর

সর্বশেষ খবর

বিশেষ খবর