আজ- বুধবার, ২৩শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিক রোজিনা ষড়যন্ত্রের শিকার!


সাংবাদিক রোজিনা ষড়যন্ত্রের শিকার!

।।  গোলাম সারওয়ার।।

করোনার শুরু থেকে অদ্যাবধি দেশের স্বাস্থ্যখাত নজিরবিহীন দুর্নীতি,অনিয়ম,অসততা,অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা এবং সমন্বয়হীনতার যে রেকর্ড গড়েছে-তা বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো যখন চরম আতংকিত,তখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের একশ্রেণির মানুষরূপী পশু জনগণের জীবন-মরণকে জিম্মি করে স্বাস্থ্যসেবার নামে লুটপাট করে নিজেরা সম্পদের পাহাড় গড়েছে। এতে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, রাষ্ট্র ও সরকারকে তারা বিশ্বের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করেছে।এইসব দুর্নীতি,অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনার অনুসন্ধানমূলক খবর যে কয়েকজন সাহসী ও কর্তব্যনিষ্ঠ সাংবাদিক বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করেছে,তার মধ্যে অন্যতম ‘প্রথম আলোর’ সিনিয়র সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম।যার কারণে রোজিনার উপর স্বাস্থ্যদপ্তরের ক্রিমিনালদের আক্রোশ এবং রাগ ছিল।সুযোগ তারা হাতছাড়া করেনি।তাঁকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিচ্ছেন।কথিত অভিযোগে অভিযুক্ত করে তাঁকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে সাংবাদিকরা বিক্ষোভ সমাবেশের বক্তব্যে বলেছেন। অযৌক্তিকভাব তাঁকে টানা ৬ ঘন্টা সচিবালয়ে আটকে রাখার ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।তাঁকে কোন চিকিৎসা দেয়া হয়নি।এতে মানবাধিকার লংঘিত হয়েছে। তাঁর ব্যাগে কী ছিল,সেটাও বলছেনা,মোবাইলে কী ধারণ করা হয়,তাও বলছেনা।সাংবাদিক রোজিনা ইতোপূর্বে ৫ সচিবের ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদে চাকরি করাসহ সাম্প্রতিককালের ভয়াবহ দুর্নীতির খবর প্রকাশ করে বরং দেশের উপকার করেছেন,রাষ্ট্রের মংগল করেছেন।যাতে ভবিষ্যতে এই ধরণের দুর্নীতি করার সাহস আর কেউ না পায়।কেউ যেন আর দেশের ক্ষতি করতে না পারে।কিন্তু উল্টো আমরা কী দেখছি।জনগণের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে নিজের জীবন বাজি রেখে যিনি তার কর্তব্য পালন করলেন,তিনিই সচিবালয়ের মত নিয়ন্ত্রিত জায়গায় হেনস্থা হলেন।অবশেষে তাঁকে এজাহারে ‘জনৈক নারী’ বলে আখ্যা দিয়ে official secrecy act মামলায় আইনের মুখোমুখি হতে হলো।হায়রে হতভাগ্য জাতি!সাংবাদিকদের মনে আরো ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করে সাংবাদিকদের কন্ঠ রোধ করা হচ্ছে।
জনগণের সঠিক তথ্য জানার অধিকার রয়েছে।সেজন্য সাংবাদিককে জাতির স্বার্থে নানা বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে সত্যিকার ও প্রকৃত তথ্য উদ্ধার করে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে হয়।পেশাগত নীতিমালানুযায়ী একজন সাংবাদিক সাধারণ জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে নৈতিকভাবে বাধ্য।অপরদিকে সবরকম সামাজিক,প্রশাসনিক,রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক অন্যায় ও অবিচারের প্রতি দৃষ্টিপাত এবং তার মাধ্যমে জনমত গড়ে তুলে শাসনযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রিত রাখার এক অমোঘ অস্ত্র সংবাদমাধ্যম।অথচ এই সংবাদমাধ্যমকে নানা কালাকানুন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করে press release,press coferenceভিত্তিক সাংবাদিক বানানো হচ্ছে।তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে যে সময়ের অপচয় হয়,তাতে করে আদৌ সাংবাদিকতা করা যায় কিনা,তা প্রশ্নের দাবি রাখে।কারণ,একদিন, একঘন্টা,মুহূর্তের তারতম্যে সংবাদমূল্য পরিস্থিতির ভিত্তিতে হ্রাস পেতে পারে।পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পচনশীল উপাদান হলো খবর।প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি খবর বাসি হয়ে যাচ্ছে।তাছাড়া একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যে সাংবাদিক অথবা সংবাদপত্র আগে খবর পরিবেশন করতে পারবে,সেই ক্রেডিটটা সবাই নিতে চায়।সুতরাং সময়ানুবর্তিতা যে কোনও খবরের মূল্যমান নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ।সময়, নদীর জোয়ার এবং খবর কারও জন্য অপেক্ষা করেনা।বিলম্বিত খবর খবরই নয়।তাই সাংবাদিককে জনস্বার্থের কথা মাথায় রেখে সমসাময়িকতাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে নানা পথ,নানা কৌশল অবলম্বন করতে হয়।
প্রেস কাউন্সিল এ্যাক্ট,১৯৭৪ এর ১১ঃ(বি) ধারা অনুযায়ী প্রণীত সাংবাদিকদের জন্য অনুসরণীয় আচরণবিধি অনুযায়ী (১)সাংবাদিকের প্রাপ্ত তথ্যাবলীর সত্যতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে এবং (২)কোন দুর্নীতি বা কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আর্থিক বা অন্য কোন অভিযোগ সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করার ক্ষেত্রে প্রতিবেদকের ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে সাধ্যমত নিশ্চিত হতে এবং প্রতিবেদককে খবরের ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করার মত যথেষ্ট তথ্য যোগাড় করতে মার্ক টোয়েনের বই চুরি অর্থাৎ জ্ঞান চুরি করাটা কতট অপরাধ বলে বিবেচিত হবে,তা জনগণের কাছে প্রশ্ন রাখলাম।সর্বোপরি সমাজের বা জনগণের মংগলের কথা চিন্তা করে চুপিসারে খবর সংগ্রহ সাংবাদিকের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে সাংবাদিকদের চিরকালের উচ্চারণ।
সবচেয়ে দুঃখজনক এবং হতাশাজনক খবর হলো,সাংবাদিক রোজিনা অসহায়ের মত একটানা ৬ ঘন্টার উপরে হেনস্থা হলো কিন্তু এরমধ্যে কোন সিনিয়র সাংবাদিক নেতাকে কোথাও কোনো বার্গেনিঙে দেখা যায়নি।আরে বড় কথা, প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে কীভাবে নিবেন।তারাও এই সংবাদটি অনলাইনে কয়েকঘন্টা পর করেছেন।
সারাদেশে রোজিনাকে হেনস্থা,নির্যাতনের প্রতিবাদে সাংবাদিকেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তাঁরা রোজিনাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে বলে উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং এর সাথে অতিরিক্ত সচিব জেবুন্নেসাসহ যারা জড়িত তাদের চিহৃিত করে অাইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন। নইলে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

লেখকঃ সাবেক সভাপতি, রাজশাহী প্রেসক্লাব। ১৮.০৫.২০২১।


এই রকম আরও খবর

সর্বশেষ খবর

বিশেষ খবর